1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

হিজাব বিতর্কে মাহিনুর ও্যজডেমির

১৪ অক্টোবর ২০০৯

সম্প্রতি বেলজিয়ামের আঞ্চলিক নির্বাচনে এমন একজন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, যাকে নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়েছে দেশটিতে৷ আর তিনি হলেন মাহিনুর ও্যজডেমির৷

https://p.dw.com/p/K5rt
ছবি: picture-alliance/dpa

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির মধ্যে মাহিনুর ও্যজডেমিরই প্রথম মহিলা সাংসদ, যিনি ইসলাম ধর্মের রীতি অনুসারে মাথায় হিজাব পরেন৷ আর তাই এই বিতর্ক৷

মাহিনুর ও্যজডেমির বেলজিয়ামের খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল বা সিডিএইচ-এর সদস্য৷ মুসলিম এই রাজনীতিক মাথায় স্কার্ফ বা হিজাব পরতেই অভ্যস্ত৷ নির্বাচন জয়ী হওয়ার পরও সংসদে অংশ গ্রহণ করছেন তিনি হিজাব পরেই৷ আর তাই প্রশ্ন উঠেছে, যে সব পোশাক আশাক ধর্মীয় প্রতীক চিহ্ন বহন করে, তা পরে আদৌ সংসদ ভবনে প্রবেশ করা যাবে কিনা৷ নির্বাচনের আগে থেকেই এ বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ওঠে৷ ভয় দেখিয়ে চিঠি লেখা, গালিগালাজ করা, ব্যঙ্গাত্মক ছবি প্রকাশ করা কিছুই বাদ যায়নি৷

২৬ বছর বয়স্ক মাহিনুর বেলজিয়ামের সংসদে সর্বকনিষ্ঠ সাংসদ৷ করিতকর্মা এই তরুণী ইউরোপে পর্দা প্রথা মেনে চলেন এমন অনেক মুসলিম নারীর কাছে যেন আশার আলো৷ অন্যদিকে অনেকের কাছে রীতিমত চক্ষুশূলও৷

মাহিনুর ও্যজডেমির এপ্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ইদানীং স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা নিয়ে বেলজিয়ামে তুমুল বিতর্ক চলছে৷ সাংসদ হিসাবে আমার শপথ গ্রহণের পর থেকে এ বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে৷ ভয় দেখানোর জন্য আমাকে চিঠি লেখা হচ্ছে, বকাবকি করা হচ্ছে৷ একজন আমাকে ইঙ্গিতপূর্ণ একটি ম্যাগাজিনও পাঠিয়েছে৷ আমাকে বলা হচ্ছে, যেখান থেকে এসেছি, সেখানেই যেন ফিরে যাই৷ এটা আমার কাছে সবচেয়ে খারাপ লেগেছে৷ কেননা চরম এক বৈরিতা প্রকাশ পায় তাতে৷ আমার সাথে কথা বলে আমার দক্ষতা ও চিন্তাধারা সম্পর্কে লোকে ধারণা করতে পারে৷ অথচ আমাকে না চিনেও কট্টর ইসলামপন্থি বলে অভিহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে৷ সেটাই আমার জন্য বেশি কষ্টদায়ক''

Mahinur Ozdemir
২৬ বছর বয়স্ক মাহিনুর বেলজিয়ামের সংসদে সর্বকনিষ্ঠ সাংসদছবি: picture-alliance/ dpa

মাহিনুর ও্যজডেমির এক অভিবাসী পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের মেয়ে৷ জন্ম ব্রাসেলেস-এ৷ তুর্কি অধ্যুসিত শ্যারবেক অঞ্চলে ফল ও সবজির দোকানের মালিক তার মা বাবা৷ এই অঞ্চলটিতে তুর্কি জনসংখ্যার হার এতই বেশি যে একে ছোট ইস্তাম্বুলও বলা হয়৷ মাহিনুরকে নিয়ে এলাকার জনগণ বেশ গর্বিত৷ নির্বাচনে সাহায্যকারী মাহিনুর ও্যজডেমিরের এক প্রতিবেশী মুস্তফা বলেন, ‘‘তাঁর জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত৷ নির্বাচনী প্রচারে আমি তাঁর পক্ষে কাজ করেছি৷ তাই আমার আনন্দটাও অনেক বেশি৷ আসলে নির্বাচনে মাহিনুরের জয় আমাকে অবাক করেনি৷ তিনি এর জন্য কঠোর পরিশ্রমও করেছেন৷''

মাহিনুরের মা গ্যুলার ও্যজডেমিরও তাঁর মেয়েকে নিয়ে গর্বিত৷ হিজাব নিয়ে এত হৈ চৈ তাঁর মোটেও বোধগম্য হচ্ছেনা৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার মেয়ের কৃতিত্বে খুব গর্বিত আমি৷ আমরা আমাদের সন্তানদের এমনভাবে বড় করেছি যাতে তারা সমাজের সকলের জন্য কাজ করতে পারে৷ তারা তুর্কি, বেলজিয়ান, মরক্কান, যাই হোন না কেন৷ আমার মেয়েকে অভিনন্দন জানাতে সবাই এসেছিলেন৷ সবাই খুব খুশি৷ বিশেষ করে হিজাব নিয়ে এত বিতর্কের পর নির্বাচনে তার জয়টা অনেকেই আশা করেনি ৷''

মুক্তগণতন্ত্রী ভালন দলের লোকজন তো এমনকি মাহিনুর ও্যজডেমিরের শপথ গ্রহণে বাধা দিতে চেয়েছিলেন৷ সংসদে ধর্মীয় প্রতীক বহন করে এমন কিছু পরা নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছিলেন তারা৷ অবশ্য তাদের এই সব দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়৷

ক্যাথলিক স্কুলে পড়া শেষ করার পর ব্রাসেল্স-এর মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন মাহিনুর৷ তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে৷ নগর পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি৷ এক জন মুসলিম হয়েও একটি খ্রিষ্টীয় রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে সংসদে অংশ গ্রহণ করছেন তিনি৷ এটা সচরাচর লক্ষ্য করা যায়না৷ এ প্রসঙ্গে মাহিনুর জানান, ‘‘আমি সিডিএইচ-এর পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ কেননা একজন তুর্কি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে বলে অভিবাসীদের বেশিরভাগই সামাজিক দলের পক্ষ নিয়েছে৷ আমার এই ইচ্ছা নেই৷ আমার পূর্ব পুরুষ ৪০ বছর ধরে বেলজিয়ামে বসবাস করছে৷ আমার জন্ম হয়েছে এখানে৷ আমি নিজেকে অভিবাসী হিসাবে দেখিনা৷ আমি সিডিএইচকে নির্বাচন করেছি যে কারণে তা হল, এটি একটি মধ্যপন্থি দল৷ মানবতাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী৷ কোনো নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আমার মুক্ত দৃষ্টি ভঙ্গি রয়েছে৷ কিন্তু আমাকে ডান বা বাম ঘরানার অন্তর্ভূক্ত করা হোক, তা আমি চাইনা৷''

সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমগুলি বেলজিয়ামের এই তরুণী সাংসদ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে৷ জাপানের টেলিভিশন থেকে শুরু করে আরব টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা পর্যন্ত সবারই দৃষ্টি তাঁর দিকে৷ তবে মাহিনুর কিছুটা বিরক্ত এই জন্য যে এরা তার হিজাবটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি৷ মাথায় কী বাঁধা সেটা তো বিচার্য হতে পারেনা৷ মস্তিষ্কের ভেতরে কী আছে সেটাই তো আসল কথা৷ আর সেখানে আছে তাঁর বুদ্ধিমত্তার ছাপ৷ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন মাহিনুর ও্যজডেমির৷ তবে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব দূর করাকে প্রাধান্য দেবেন তিনি৷ ঘেটো তৈরির বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিতে সচেষ্ট হবেন, মনোযোগ দেবেন পরিবেশ সংরক্ষণেও৷

প্রতিবেদক: রায়হানা বেগম

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক